নরওয়ের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীরে: অপ্রত্যাশিত সুবিধা যা আপনি কখনোই কল্পনা করেননি

webmaster

노르웨이 공공 의료 시스템 - **Prompt 1: Universal Primary Healthcare in Norway**
    "A bright, modern Norwegian primary care cl...

বন্ধুরা, কেমন আছেন সবাই? আজ আমি আপনাদের এমন এক দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলব, যা শুনলে আপনি সত্যিই অবাক হয়ে যাবেন। নরওয়ে, যে দেশটা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর জীবনযাত্রার উচ্চ মানের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত, সেখানকার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কতটা উন্নত আর মানুষের জন্য কতটা উপকারী, তা আমরা অনেকেই জানি না। আমি যখন প্রথম নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে জেনেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল, ইশ!

노르웨이 공공 의료 시스템 관련 이미지 1

যদি আমাদের দেশেও এমন একটা কাঠামো থাকতো! সব নাগরিকের জন্য প্রায় বিনামূল্যে উচ্চমানের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা – এটা যেন কল্পনারও অতীত। ভাবছেন, কীভাবে চলে এই সবকিছু আর এর ভেতরের আসল চিত্রটা কেমন?

তাহলে চলুন, নিচে আরও বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

নরওয়ের স্বাস্থ্যসেবা: সবার জন্য সমান সুযোগের গল্প

বন্ধুরা, নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটা অসাধারণ দিক হলো, এটা সবার জন্য। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, এখানে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষ, সে যেই হোক না কেন, সবার জন্য উচ্চমানের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। আমার তো এটা শুনেই মনে হয়, এমন একটা ব্যবস্থা যদি আমাদের দেশেও থাকত! জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা আর্থিক অবস্থা, কোনোকিছুই এখানে চিকিৎসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। ভাবুন তো একবার, আপনার অসুস্থতার সময় অর্থের চিন্তা না করে শুধু চিকিৎসার দিকে মনোযোগ দিতে পারছেন, কেমন লাগত? নরওয়েতে এই ব্যাপারটা একটা বাস্তব চিত্র। এই সার্বজনীন কভারেজ মানে হলো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে জটিল রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাও এর আওতায় আসে। এটা শুধু একটা সেবা নয়, এটা যেন মানুষের মৌলিক অধিকারের একটা অংশ, যা এখানকার সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখেছে। দেশের অধিকাংশ স্বাস্থ্য ব্যয় মেটানো হয় সাধারণ কর এবং জাতীয় বীমা প্রকল্পের মাধ্যমে, যা কর্মচারী ও নিয়োগকর্তা উভয়ের অবদান থেকে আসে। এর ফলে রোগীদের উপর সরাসরি আর্থিক চাপ অনেক কমে যায়, যা সত্যি প্রশংসার যোগ্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যখন একটি দেশের নাগরিকরা জানে যে, তাদের সরকার তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি এতটা যত্নশীল, তখন সেই দেশের প্রতি তাদের বিশ্বাস আর ভালোবাসা আরও গভীর হয়।

প্রথম কথা, সবার জন্য সমান সুযোগ

নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল মন্ত্রই হলো ‘সবার জন্য সমান সুযোগ’। এখানে আপনি ধনী হোন বা গরীব, যেই হন না কেন, আপনার অসুস্থতায় একই মানের চিকিৎসা পাবেন। এটা যেন একটা বিশাল স্বস্তির ব্যাপার, তাই না? বিশেষ করে যখন দেখি, অনেক দেশে চিকিৎসার জন্য মানুষ ভিটেমাটি বিক্রি করে দেয়, তখন নরওয়ের এই মডেলটা আমাকে মুগ্ধ করে। দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষই এই জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। এই কভারেজের পরিধিটা এত বড় যে, প্রাথমিক ডাক্তার দেখানো থেকে শুরু করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা, এমনকি কিছু নির্দিষ্ট প্রেসক্রিপশনের ওষুধও এর আওতায় পড়ে। এর পেছনের মূল উদ্দেশ্যই হলো, কেউ যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এমন একটা ব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, সেটা একটা সুস্থ ও শক্তিশালী সমাজ গঠনে কতটা সাহায্য করে, তা বলে বোঝানো মুশকিল।

কেমন এই সর্বজনীন মডেল?

নরওয়ের সর্বজনীন স্বাস্থ্য মডেলটি একটি অর্ধ-বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে চলে। এর মানে হলো, কেন্দ্রীয় সরকার যেমন স্বাস্থ্য নীতি ও তত্ত্বাবধানে জড়িত, তেমনি স্থানীয় পৌরসভাগুলোও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি পরিষেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চারটা আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ (Regional Health Authorities) আছে, যারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা এবং হাসপাতালগুলোর দেখভাল করে। এই সমন্বিত পদ্ধতিই নিশ্চিত করে যে, দেশের প্রতিটি প্রান্তে যেন স্বাস্থ্যসেবা সমানভাবে পৌঁছায়। আমার মনে হয়, এই বিকেন্দ্রীকরণ এবং সমন্বয়টাই নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম সাফল্যের চাবিকাঠি। এতে করে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী পরিষেবা দেওয়া সহজ হয়, আবার সামগ্রিক মানও বজায় থাকে।

কীভাবে চলে নরওয়ের এই জাদুর মতো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা?

নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটা যেন একটা বিশাল ঘড়ির মতো, যেখানে প্রতিটি অংশ একে অপরের সাথে নিখুঁতভাবে কাজ করে। এই পুরো সিস্টেমটা একটা অর্ধ-বিকেন্দ্রীভূত মডেল অনুসরণ করে। এর মানে হলো, কেন্দ্রীয় সরকার স্বাস্থ্য নীতি ও নির্দেশনা তৈরি করে, কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্বটা স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত ভাগ করা। যেমন, দেশের স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা পরিষেবার মন্ত্রনালয় পুরো ব্যবস্থার পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ আর তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকে। অন্যদিকে, চারটি আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দেশের হাসপাতালগুলো এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পরিষেবা পরিচালনা করে। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আমাদের পরিচিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, যেমন পারিবারিক ডাক্তার বা জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) এর দায়িত্বে থাকে স্থানীয় পৌরসভাগুলো। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, আমি যখন নরওয়ের এই কাঠামো নিয়ে ভাবি, তখন মনে হয়, এটা কেবল স্বাস্থ্যসেবা নয়, এটা আসলে একটা বিশাল সামাজিক বিনিয়োগ, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সুস্থ জীবনযাপনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি সত্যিই আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করে।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাই মূল ভিত্তি

নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। এখানে প্রতিটি নিবন্ধিত বাসিন্দা একজন পারিবারিক ডাক্তার (fastlege) পাওয়ার অধিকারী, সে কাজ করুক বা না করুক। এই পারিবারিক ডাক্তাররা মূলত গেটকিপার বা দ্বাররক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। এর মানে হলো, কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে হলে বা হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে, প্রথমে আপনার পারিবারিক ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে হবে। এই ব্যবস্থাটা শুনতে হয়তো একটু জটিল মনে হতে পারে, কিন্তু এর একটা দারুণ সুবিধা আছে। এটি অপ্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ভিড় কমায় এবং নিশ্চিত করে যে, আপনার সত্যিই যখন একজন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন, তখনই আপনি সেই সেবা পাচ্ছেন। আমি যখন এই ব্যাপারটা প্রথম শুনেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল, এটা তো সময় এবং অর্থের দারুণ সাশ্রয়! আর হ্যাঁ, আপনি আপনার পছন্দের একজন জিপি বেছে নিতে পারেন, যা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে একটি ভালো ব্যাপার মনে হয়েছে। স্থানীয় পৌরসভাগুলো এই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন এবং জরুরি পরিষেবা পরিচালনার দায়িত্বে থাকে। তারা স্বাধীন ডাক্তারদের সাথে চুক্তির মাধ্যমে এই পরিষেবাগুলো সমন্বয় করে।

হাসপাতাল আর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ভূমিকা

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পেরিয়ে যখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তখন হাসপাতালের ভূমিকা চলে আসে। নরওয়েতে বেশিরভাগ হাসপাতালই সরকারি এবং এগুলো আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষগুলোর অধীনে পরিচালিত হয়। এখানে ২০টি পাবলিক হাসপাতাল ট্রাস্ট রয়েছে, যা একটি বিশাল হাসপাতাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এই হাসপাতালগুলো সাধারণত জটিল রোগ বা জরুরি অবস্থার জন্য সেবা দেয়। আমার মনে আছে, একবার একজন বন্ধুর নরওয়েতে জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন হয়েছিল, আর সে বলেছিল, পুরো প্রক্রিয়াটা এত মসৃণ ছিল যে, সে চিন্তার কোনো সুযোগই পায়নি। চিকিৎসকরা অত্যন্ত পেশাদার এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল বিশেষায়িত এবং অত্যন্ত জটিল চিকিৎসা প্রদান করে থাকে। বেসরকারি ক্লিনিকও কিছু আছে, তবে সেগুলো মূলত জনস্বাস্থ্য পরিষেবার সাথে চুক্তি না থাকলে সরকারি তহবিল থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না। তাই, বেশিরভাগ মানুষই সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল থাকে, যা তাদের জন্য উচ্চমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করে।

Advertisement

চিকিৎসার খরচ? আপনার পকেট কতটা খালি হবে?

নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটা দিক যা আমাকে সবসময় অবাক করে তা হলো, এখানে চিকিৎসা সেবার জন্য আপনার পকেট একেবারেই খালি হয়ে যাবে না। আমি যখন শুনি অন্যান্য দেশে চিকিৎসার বিল আকাশচুম্বী হয়, তখন নরওয়ের এই ব্যবস্থাটা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। যদিও নরওয়ের স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নয়, তবে এর সিংহভাগই সরকার ভর্তুকি দেয়। হ্যাঁ, কিছু পরিষেবার জন্য আপনাকে সামান্য ইউজার ফি (egenandel) দিতে হতে পারে, যেমন ফ্যামিলি ডাক্তার দেখানো বা জরুরি পরিষেবা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে। কিন্তু এই ইউজার ফিগুলোর একটা নির্দিষ্ট বার্ষিক সীমা আছে, যা “exemption card” নামে পরিচিত। আমি যখন প্রথম এটা শুনেছিলাম, তখন ভেবেছিলাম, বাহ! এটা তো দারুণ একটা সুরক্ষা কবচ! একবার যখন আপনার ইউজার ফি এই বার্ষিক সীমায় পৌঁছে যাবে, তখন বছরের বাকি সময়টায় আপনি আর কোনো ফি ছাড়াই সব চিকিৎসা সেবা পাবেন। এর মানে হলো, কেউই যেন অসুস্থতার কারণে আর্থিক সংকটে না পড়ে। আমার মনে হয়, এই ব্যবস্থাটা এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে প্রত্যেকের জন্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়, পাশাপাশি মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ডাক্তার দেখাতে না যায়। এটি মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তোলে এবং মানসিক শান্তি এনে দেয়।

ইউজার ফি এবং সুরক্ষার সীমা

আপনি যখন নরওয়েতে একজন জেনারেল প্র্যাকটিশনার (GP) বা আওয়ার-আফটার-কেয়ার সার্ভিস ব্যবহার করেন, তখন আপনাকে একটি ইউজার ফি দিতে হয়। তবে, চিন্তা করবেন না, এই ফি খুবই সামান্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ইউজার ফিগুলোর জন্য একটি বার্ষিক সর্বোচ্চ সীমা (annual cost-sharing ceilings) রয়েছে। ২০২৪ সালের তথ্যানুসারে, এই সীমা প্রায় NOK ৩,১৬৫ (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩০,০০০-এর বেশি, কিন্তু এটি ওঠানামা করে) এই সীমা একবার পূরণ হয়ে গেলে, বছরের বাকি সময়ের জন্য আপনি সমস্ত চিকিৎসা সেবা, এমনকি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ এবং চিকিৎসার জন্য যাতায়াত খরচও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাবেন। হাসপাতাল ভর্তি হলে বা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে থাকলে, আপনার কোনো খরচ লাগে না, এমনকি ঔষধ বা থাকার জন্যও নয়। আমি জানি, এই ধরনের ব্যবস্থা আমাদের দেশে স্বপ্ন মনে হতে পারে, কিন্তু নরওয়েতে এটি একটি বাস্তব সত্য, যা প্রতিটি নাগরিককে আর্থিক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেয়।

দাঁতের চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ

দাঁতের চিকিৎসার ক্ষেত্রে নরওয়েতে কিছুটা ভিন্ন নিয়ম রয়েছে। সাধারণত, ২০ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের জন্য সরকারিভাবে বিনামূল্যে দাঁতের চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, সাধারণত নিজেদেরই দাঁতের চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয়, তবে কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম আছে। এছাড়াও, কিছু ঔষধের খরচ রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে দিতে হতে পারে, যদিও সেগুলোর জন্যও বার্ষিক সীমা কার্যকর থাকে। তবে, বেসরকারি স্বাস্থ্য বীমা কেনার সুযোগও আছে, যদি আপনি আরও দ্রুত সেবা পেতে চান বা আপনার পছন্দের প্রাইভেট ডাক্তারের কাছে যেতে চান। প্রায় ১০% নরওয়েজিয়ান এই ধরনের বেসরকারি বীমা কেনে, মূলত দ্রুত অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং আরও বেশি বিকল্পের জন্য। কিন্তু সার্বিকভাবে বলতে গেলে, নরওয়ের পাবলিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা সেবা সবার জন্য সহজলভ্য হয়, যা সত্যিই আমার মন ছুঁয়ে গেছে।

জরুরি থেকে বিশেষ চিকিৎসা: সবকিছুই আছে হাতের নাগালে

আমরা যখন অসুস্থ হই, তখন সবচেয়ে আগে মনে হয়, একজন ভালো ডাক্তার পাব তো? নরওয়েতে এই চিন্তাটা আপনার মাথায় খুব বেশি আসবে না। কারণ এখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে বিশেষায়িত চিকিৎসাও আপনার হাতের নাগালে থাকে। আমার তো মনে হয়, এটা যেন একটা সুপরিকল্পিত জাল, যেখানে কোনো মানুষই চিকিৎসার অভাবে পড়ে যায় না। যদি কখনো গুরুতর কিছু হয়, যেমন দুর্ঘটনা বা হঠাৎ করে মারাত্মক অসুস্থতা, তখন আপনি সরাসরি জরুরি নম্বরে (১১৩) কল করতে পারেন। আর যদি রাতের বেলা বা ছুটির দিনে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন, যা ততটা গুরুতর নয়, তখন আওয়ার-আফটার-কেয়ার সার্ভিসে (১১৬ ১১৭) ফোন করলে ২৪ ঘণ্টাই চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া যায়। এই সেবাগুলো প্রতিটি পৌরসভায়ই আছে, যা আমাকে খুবই আশ্বস্ত করে। এছাড়াও, বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত চিকিৎসা, যেমন ক্যান্সার, হৃদরোগ বা মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাও এখানে অত্যন্ত উন্নত। হাসপাতালগুলো এই ধরনের জটিল রোগের জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে সজ্জিত। আমি যখন একজন বন্ধুকে এখানকার মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কে বলতে শুনেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল, আমাদের সমাজেও এই বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

জরুরি অবস্থায় কী করবেন?

নরওয়েতে জরুরি অবস্থার জন্য একদম পরিষ্কার নির্দেশনা আছে। যদি জীবন বিপন্ন হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটে, যেমন গুরুতর দুর্ঘটনা বা হার্ট অ্যাটাক, তাহলে দেরি না করে সরাসরি ১১৩ নম্বরে ফোন করা উচিত। এই নম্বরটি ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে এবং দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই ধরনের স্পষ্ট জরুরি পরিষেবা থাকাটা মানুষের জন্য বিশাল এক স্বস্তির বিষয়। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ দ্বিধায় পড়ে যায় কোথায় যাবে বা কাকে ডাকবে। নরওয়েতে এই দ্বিধা করার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়াও, যদি জরুরি অবস্থা ততটা গুরুতর না হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন, যেমন গভীর রাতে জ্বর বা অন্য কোনো অসুস্থতা, তখন আপনি ১১৬ ১১৭ নম্বরে ফোন করতে পারেন। এই সেবাটি প্রতিটি পৌরসভাতেই উপলব্ধ এবং সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করে। এটি নিশ্চিত করে যে, ছোটখাটো সমস্যাগুলোর জন্যও যেন মানুষ সঠিক সময়ে চিকিৎসা পায় এবং পরিস্থিতি যেন জটিল না হয়।

বিশেষায়িত চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদী যত্ন

নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিশেষায়িত চিকিৎসার মানও অনেক উন্নত। ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্নায়ুরোগের মতো জটিল সমস্যাগুলোর জন্য এখানে রয়েছে বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ক্লিনিক। এই হাসপাতালগুলোতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ চিকিৎসকদের একটি দল কাজ করে। আমি যখন এখানকার চিকিৎসকদের পেশাদারিত্বের কথা শুনি, তখন সত্যিই মুগ্ধ হয়ে যাই। তাদের গবেষণার প্রতিও বেশ মনোযোগ থাকে, যা নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির বিকাশে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, নরওয়েতে দীর্ঘমেয়াদী যত্ন (long-term care) পরিষেবারও একটি উন্নত ব্যবস্থা আছে। বয়স্ক বা দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য পৌরসভাগুলো দীর্ঘমেয়াদী যত্ন পরিষেবা প্রদান করে। এটি নিশ্চিত করে যে, যারা নিজেদের যত্ন নিতে অক্ষম, তারাও যেন মানবিক এবং মানসম্মত পরিষেবা পায়। আমার তো মনে হয়, এমন একটি সমাজ যেখানে প্রতিটি মানুষকে তার জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত যত্ন নেওয়া হয়, সেটা একটি আদর্শ সমাজ।

Advertisement

একজন রোগী হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা কেমন হতে পারে?

বন্ধুরা, নরওয়েতে একজন রোগী হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতাটা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আমি যখন ভাবি, তখন মনে হয়, এটি অনেকটা স্বস্তিদায়ক এবং সুসংগঠিত। আমি নিজে যদিও নরওয়েতে রোগী হিসেবে সরাসরি কোনো অভিজ্ঞতা অর্জন করিনি, তবে যাদের অভিজ্ঞতা শুনেছি, তাতে একটা পরিষ্কার চিত্র পাই। প্রথমত, আপনি যখন নরওয়ের বাসিন্দা হিসেবে নিবন্ধন করবেন, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে একজন পারিবারিক ডাক্তার (GP) পেয়ে যাবেন। এটি একটি দারুণ সুবিধা, কারণ আপনার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য সবসময় একজন নির্দিষ্ট ডাক্তার থাকবে, যিনি আপনার মেডিকেল ইতিহাস সম্পর্কে অবগত থাকবেন। আপনি চাইলে নিজের GP পরিবর্তনও করতে পারবেন, যা পছন্দের স্বাধীনতা দেয়। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত কিছু অপেক্ষার সময় থাকে, বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের জন্য। তবে, গুরুতর বা জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় অনেক কম থাকে। আমি যখন প্রথম জেনেছিলাম যে, হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হলে চিকিৎসার জন্য কোনো বিল দিতে হয় না, তখন আমার চোখ কপালে উঠেছিল! এটা তো অসাধারণ ব্যাপার! রোগীদের মতামত এবং অভিযোগ জানানোর জন্য এখানে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে, যা সেবার মান উন্নয়নে সাহায্য করে। আমার মনে হয়, এই সবকিছু মিলিয়ে একজন রোগী হিসেবে আপনি এখানে সম্মান, যত্ন এবং মানসম্মত চিকিৎসা পাবেন।

আপনার পারিবারিক ডাক্তার: বন্ধু নাকি পথপ্রদর্শক?

নরওয়েতে আপনার পারিবারিক ডাক্তারকে (fastlege) আপনি বন্ধুর মতো বিশ্বাস করতে পারবেন। তিনি শুধুমাত্র আপনার চিকিৎসা করেন না, বরং আপনার স্বাস্থ্য যাত্রার একজন পথপ্রদর্শকও বটে। আপনার শারীরিক বা মানসিক যেকোনো সমস্যা নিয়ে আপনি প্রথমে তার সাথে কথা বলবেন। তিনি আপনার সমস্ত মেডিকেল রেকর্ড রাখেন এবং প্রয়োজনে আপনাকে বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করেন। এর ফলে, আপনার চিকিৎসা প্রক্রিয়াটা অনেক সুসংগঠিত হয় এবং একই তথ্য বারবার বলতে হয় না। আমি মনে করি, একজন পারিবারিক ডাক্তারের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক থাকাটা খুব জরুরি, কারণ তিনি আপনার শরীর ও মন সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। এটা যেন একজন ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য উপদেষ্টার মতো, যিনি সবসময় আপনার পাশে আছেন। এমনকি, আপনি যদি আপনার বর্তমান জিপির সাথে সন্তুষ্ট না হন, তাহলে সরকারি তালিকা থেকে অন্য জিপি বেছে নেওয়ার সুযোগও আছে। এটি রোগীদের পছন্দের স্বাধীনতা দেয়, যা আমার কাছে খুবই ইতিবাচক মনে হয়েছে।

অপেক্ষা সময় ও রোগীর অধিকার

নরওয়েতে কিছু নির্দিষ্ট চিকিৎসার জন্য, বিশেষ করে ইলেকটিভ বা পূর্বপরিকল্পিত চিকিৎসার ক্ষেত্রে, কিছু অপেক্ষার সময় (waiting times) থাকতে পারে। তবে, সরকার এই অপেক্ষার সময় কমানোর জন্য ক্রমাগত চেষ্টা করছে এবং বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপও নিয়েছে। আমার মনে হয়, যেকোনো উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই এটি একটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ। তবে, জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে কোনো অপেক্ষার প্রশ্নই আসে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নরওয়েতে রোগীদের অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। রোগীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট “রোগীর অধিকার আইন” (Patient Rights Act) রয়েছে, যা ১৯৯৯ সালে কার্যকর হয়। এই আইন নিশ্চিত করে যে, রোগীদের তথ্য জানার অধিকার আছে, চিকিৎসার বিষয়ে মতামত দেওয়ার অধিকার আছে এবং অভিযোগ জানানোর অধিকার আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যখন একজন রোগী তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে, তখন সে আরও আত্মবিশ্বাসের সাথে চিকিৎসা নিতে পারে। এই সবই একজন মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

노르웨이 공공 의료 시스템 관련 이미지 2

স্বাস্থ্যসেবার মান আর আধুনিকতার ছোঁয়া: সত্যিই কি সেরা?

নরওয়ের স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে কথা বলতে গেলে, আমার মনে হয়, এটি বিশ্বের সেরাগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমি যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট পড়ি, তখন দেখি যে নরওয়েজিয়ানরা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় দীর্ঘ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করে। এটা তো কেবল কাকতালীয় নয়, এর পেছনে এখানকার উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবা এবং কার্যকরী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বিশাল অবদান রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তির ব্যবহার এখানে সাধারণ ব্যাপার। আমি শুনেছি, তাদের কাছে MRI স্ক্যানারের মতো ডায়াগনস্টিক সরঞ্জাম ইউরোপের মধ্যে অন্যতম বেশি ঘনত্বের সাথে উপলব্ধ। এর মানে হলো, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসায় তারা সবসময় আপডেটেড থাকার চেষ্টা করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ মানে শুধু হাসপাতালের ভবন তৈরি করা নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষিত জনশক্তির পেছনেও বিনিয়োগ করা। আর নরওয়ে এই দুই ক্ষেত্রেই বেশ এগিয়ে। তবে, তাদের কিছু চ্যালেঞ্জও আছে, যেমন অপেক্ষার সময় কমানো এবং কর্মীর দক্ষতা উন্নয়ন। কিন্তু তারা এগুলোর সমাধানেও নিয়মিত কাজ করছে।

প্রযুক্তি আর আধুনিক উপকরণের ব্যবহার

নরওয়ের হাসপাতালগুলোতে যখন আধুনিক প্রযুক্তির কথা ভাবি, তখন আমার মনে হয়, তারা যেন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কাজ করছে। ডায়াগনস্টিক ইমেজিং, যেমন এমআরআই (MRI) স্ক্যানার, সিটি (CT) স্ক্যানার, ইত্যাদির সুবিধা এখানে অনেক বেশি। এটি রোগ নির্ণয়কে আরও দ্রুত এবং নির্ভুল করে তোলে। এছাড়া, টেলিমেডিসিন এবং ই-হেলথ (e-health) পরিষেবার ব্যবহারও বাড়ছে, যা বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। আমার মনে হয়, প্রযুক্তির এই ব্যবহার কেবল চিকিৎসার মানই বাড়ায় না, বরং রোগীদের জন্য আরও বেশি সুবিধা নিয়ে আসে। আমি যখন চিন্তা করি যে, একজন ডাক্তার দূর থেকেও রোগীকে পরামর্শ দিতে পারছেন বা তার রেকর্ড দেখতে পারছেন, তখন মনে হয়, এটি সময়ের কত বড় এক পরিবর্তন! এই ডিজিটাল রূপান্তর স্বাস্থ্যসেবাকে আরও অ্যাক্সেসযোগ্য এবং কার্যকর করে তুলছে, যা সত্যি আমাকে মুগ্ধ করে।

চিকিৎসক ও নার্সদের দক্ষতা

নরওয়ের স্বাস্থ্যসেবার আরেকটি শক্তিশালী দিক হলো এখানকার চিকিৎসক ও নার্সদের উচ্চ দক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব। বিগত কয়েক দশকে চিকিৎসক ও নার্স সহ বেশিরভাগ স্বাস্থ্যকর্মী গ্রুপের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রতি ১,০০,০০০ জন অধিবাসীর জন্য স্বাস্থ্যকর্মী এখানে অনেক বেশি। তারা শুধু প্রশিক্ষিতই নন, বরং রোগীদের প্রতি তাদের সহানুভূতি এবং যত্নও প্রশংসার যোগ্য। আমি যখন একজন বন্ধুর কাছ থেকে এখানকার নার্সদের সেবার কথা শুনেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল, তারা যেন শুধু চিকিৎসা কর্মী নন, বরং রোগীর পরিবারের একজন সদস্যের মতো যত্ন নেন। এই ব্যক্তিগত যত্ন এবং পেশাদারিত্ব রোগীদের দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। আমার মনে হয়, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার জন্য দক্ষ এবং সহানুভূতিশীল কর্মী বাহিনী থাকাটা অপরিহার্য, আর নরওয়ে এই ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

Advertisement

চ্যালেঞ্জগুলো কী, আর কীভাবে মোকাবিলা করছে নরওয়ে?

বন্ধুরা, কোনো ব্যবস্থাই নিখুঁত হয় না, নরওয়ের উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থারও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। আমি যখন এই চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে ভাবি, তখন মনে হয়, তারা সেগুলো মোকাবিলায় কতটা আন্তরিক। প্রথমত, বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের প্রাদুর্ভাব নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর একটি নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। যেমন আমাদের দেশেও এখন বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, ঠিক তেমনি নরওয়েতেও এই বিষয়টি তাদের ভাবাচ্ছে। এছাড়া, কিছু নির্বাচিত চিকিৎসার জন্য অপেক্ষার সময় (waiting times) একটি সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে, যা রোগীদের মধ্যে অসন্তোষের কারণ হতে পারে। কিন্তু নরওয়েজিয়ান সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে সচেতন এবং সমাধানের জন্য বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তারা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি কেয়ারকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, যাতে মানুষ হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই আরও বেশি সেবা পেতে পারে। এছাড়াও, স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব মোকাবিলা, অপেক্ষার সময় কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটালাইজেশন চালিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলোতে তারা মনোযোগ দিচ্ছে। আমার মনে হয়, যেকোনো ব্যবস্থার সাফল্য শুধু তার অর্জন দিয়েই পরিমাপ করা হয় না, বরং সে তার চ্যালেঞ্জগুলোকে কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করছে, তা দিয়েও পরিমাপ করা হয়।

বয়স বাড়ছে, চ্যালেঞ্জও বাড়ছে

নরওয়ের জনসংখ্যা ধীরে ধীরে বয়স্ক হচ্ছে, যা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মতোই একটি প্রবণতা। এর ফলে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদী যত্ন এবং ক্রনিক রোগের চিকিৎসার চাহিদা বাড়ছে। আমার তো মনে হয়, যখন একটি সমাজের মানুষ দীর্ঘ জীবন লাভ করে, তখন তাদের সুস্থ জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা দেওয়াটাও সরকারের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতি নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করছে, কারণ বয়স্ক রোগীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা এবং আরও বেশি সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন হয়। নরওয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ‘বয়স-বান্ধব’ করার চেষ্টা করছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে। তারা প্রাথমিক ও কমিউনিটি কেয়ারকে আরও শক্তিশালী করে এবং বিভিন্ন ধরনের যত্নের মধ্যে সমন্বয় উন্নত করে এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে চাইছে। এটি নিশ্চিত করে যে, বয়স্করাও যেন তাদের জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পায়।

অপেক্ষা আর সমন্বয়ের গল্প

যদিও নরওয়েতে স্বাস্থ্যসেবার মান অনেক ভালো, তবুও কিছু নির্বাচিত চিকিৎসার জন্য রোগীদের অপেক্ষার সময় এখনও একটি উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে যখন কোনো জরুরি অবস্থা থাকে না, তখন অনেক সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে কিছুটা দেরি হতে পারে। কিন্তু সরকার এই সমস্যা সমাধানের জন্য বদ্ধপরিকর। ২০২৪ সালের একটি নতুন জাতীয় স্বাস্থ্য ও সহযোগিতা পরিকল্পনায়, নরওয়েজিয়ান সরকার কর্মীবাহিনী উন্নয়ন, যত্নের সমন্বয় উন্নত করা এবং অপেক্ষার সময় কমানোর মতো লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এছাড়াও, বিভিন্ন স্তরের যত্নের মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় আনার চেষ্টা চলছে, যাকে তারা ‘হেলথকেয়ার কমিউনিটিস’ (helsefellesskap) বলে। আমার মনে হয়, এই সমন্বয়টা খুবই জরুরি, কারণ এতে করে রোগীদের চিকিৎসা পথ আরও মসৃণ হয় এবং একই তথ্য বারবার দিতে হয় না। এটি রোগীর অভিজ্ঞতাকে উন্নত করে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ায়।

আসুন নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক একটি ছকের মাধ্যমে দেখে নিই:

বৈশিষ্ট্য বর্ণনা
সর্বজনীন কভারেজ নরওয়েতে বসবাসকারী সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়।
অর্থায়ন মূলত সাধারণ কর এবং জাতীয় বীমা প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়।
ইউজার ফি কিছু পরিষেবার জন্য সামান্য ইউজার ফি নেওয়া হয়, তবে বার্ষিক সর্বোচ্চ সীমা রয়েছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি বাসিন্দা একজন পারিবারিক ডাক্তার (GP) পাওয়ার অধিকারী, যা স্থানীয় পৌরসভা দ্বারা পরিচালিত হয়।
বিশেষায়িত সেবা হাসপাতাল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা চারটি আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দ্বারা পরিচালিত হয়।
জরুরি পরিষেবা ১১৩ (জীবন বিপন্ন) এবং ১১৬ ১১৭ (সাধারণ জরুরি) নম্বরে ২৪/৭ সেবা উপলব্ধ।
দাঁতের যত্ন ২০ বছর বা তার কম বয়সীদের জন্য বিনামূল্যে, প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত নিজস্ব খরচ।

গল্পের শেষ প্রান্তে…

বন্ধুরা, নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা দেখলাম, কীভাবে একটি দেশ তার প্রতিটি নাগরিকের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর অন্যদের কাছ থেকে শোনা গল্পগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে, স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসা নয়, এটা মানবিকতার এক বিশাল উদাহরণ। এখানে আপনি শুধু একজন রোগী নন, বরং একটি সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হন, যার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। উন্নত চিকিৎসা, সবার জন্য সমান সুযোগ, এবং আর্থিক সুরক্ষার এই সমন্বয় নরওয়েকে একটি অনুকরণীয় মডেলে পরিণত করেছে। আমি মন থেকে চাই, বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে যেন এমন একটি ব্যবস্থা একদিন গড়ে ওঠে, যেখানে চিকিৎসার জন্য কাউকে দুশ্চিন্তা করতে না হয়।

Advertisement

জেনে রাখুন কিছু দরকারী টিপস

১. নরওয়েতে আপনার বসবাসের নিবন্ধন করার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন পারিবারিক ডাক্তার (GP) নির্বাচন করুন, এটি আপনার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার গেটওয়ে।
২. জরুরি অবস্থার জন্য ১১৩ এবং কম গুরুতর কিন্তু তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে ১১৬ ১১৭ নম্বর দুটি মনে রাখুন।
৩. চিকিৎসার জন্য সামান্য ইউজার ফি দিতে হলেও, বার্ষিক সীমা (exemption card) সম্পর্কে জানুন, যা আপনাকে অতিরিক্ত খরচ থেকে বাঁচাবে।
৪. আপনার যেকোনো স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়ে পারিবারিক ডাক্তারের সাথে খোলাখুলি কথা বলুন, তিনিই আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।
৫. অপেক্ষার সময় নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, তাহলে আপনার ডাক্তার বা স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে দ্বিধা করবেন না।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এক নজরে

নরওয়ের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সার্বজনীন, যেখানে দেশের সকল নাগরিকের জন্য উচ্চমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। এর অর্থায়ন মূলত কর এবং জাতীয় বীমার মাধ্যমে হয়। কিছু সেবার জন্য সামান্য ইউজার ফি থাকলেও, একটি বার্ষিক সর্বোচ্চ সীমা থাকায় কেউই আর্থিক সংকটে পড়ে না। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পারিবারিক ডাক্তারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা স্থানীয় পৌরসভাগুলোর দায়িত্ব। হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যদিও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি এবং কিছু নির্বাচিত চিকিৎসার জন্য অপেক্ষার সময় কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, নরওয়ে সরকার ক্রমাগত সংস্কারের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করছে। সার্বিকভাবে, এটি একটি দক্ষ, মানবিক এবং নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖

প্র: নরওয়ের স্বাস্থ্যসেবা কি সত্যিই সবার জন্য বিনামূল্যে? নাকি এর পেছনে কোনো লুকানো খরচ আছে?

উ: এই প্রশ্নটা আমার নিজের মনেও বহুবার এসেছে। যখন প্রথম শুনি নরওয়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রায় বিনামূল্যে, তখন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না! তবে হ্যাঁ, একেবারে ‘সম্পূর্ণ বিনামূল্যে’ বলাটা হয়তো কিছুটা ভুল হবে, কিন্তু এর সুবিধাগুলো এতটাই অসাধারণ যে ছোটখাটো কিছু খরচ আপনার চোখেও পড়বে না। নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মূলত সরকার দ্বারা পরিচালিত হয় এবং এর সিংহভাগ খরচ আসে জনগণের দেওয়া ট্যাক্স থেকে। এর মানে হলো, আপনি যখন আয় করেন, তখন আপনার ট্যাক্সের একটা অংশ এই স্বাস্থ্যসেবায় চলে যায়।
তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে সামান্য সহ-পেমেন্ট বা কো-পে দিতে হতে পারে। যেমন ধরুন, ডাক্তারের কাছে গেলে বা কিছু নির্দিষ্ট ঔষধ কেনার সময়। কিন্তু চিন্তা করবেন না, এই খরচগুলো এতটাই কম যে আমাদের দেশের প্রাইভেট হাসপাতালের ফি-এর তুলনায় কিছুই নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রতি বছর এই সহ-পেমেন্টের একটা সর্বোচ্চ সীমা আছে। একবার আপনি সেই সীমা পার করে ফেললে, বাকি বছরের জন্য আপনার সমস্ত চিকিৎসা খরচ সরকার বহন করবে। একে “ফ্রি কার্ড” সিস্টেম বলা হয়। জরুরি অবস্থার জন্য তো কোনো টাকাই লাগে না!
আমার মনে হয়, এই পদ্ধতিটা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য, কারণ এর ফলে কেউ টাকার অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয় না।

প্র: নরওয়েতে একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে স্বাস্থ্যসেবা পাবে, বিশেষ করে যারা নতুন এসেছেন বা বিদেশী?

উ: নরওয়েতে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াটা আমাদের দেশের মতো হঠাৎ করে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের গেটে চলে যাওয়া নয়। এখানে একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে চলতে হয়। সবার আগে আপনাকে একজন জেনারেল প্র্যাকটিশনার (GP) বা পারিবারিক ডাক্তারের সাথে রেজিস্টার করতে হবে। তিনিই আপনার প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্বে থাকবেন। আপনার কোনো সমস্যা হলে প্রথমে তার কাছেই যেতে হবে। তিনি যদি মনে করেন আপনার একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন, তবে তিনিই আপনাকে রেফার করবেন। এই GP সিস্টেমটা আমার কাছে খুবই কার্যকরী মনে হয়েছে। কারণ, এতে অপ্রয়োজনীয় ভিড় কমে এবং আপনার মেডিকেল হিস্টোরি একজন ডাক্তারই খুব ভালোভাবে জানেন।
যারা নতুন নরওয়েতে গেছেন, তাদের জন্য এই রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি নরওয়ের ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স স্কিমের আওতায় আসেন, তাহলে আপনি এই সুবিধাগুলোর অধিকারী হবেন। আমার পরিচিত অনেকেই নরওয়েতে গিয়ে প্রথমে এই GP রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারটা নিয়ে একটু বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু একবার যখন বুঝে গেলেন, তখন দেখলেন এটা কত সহজ আর কতটা গোছানো। এতে সময়ও বাঁচে আর সঠিক চিকিৎসা পাওয়াও নিশ্চিত হয়।

প্র: নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এত উন্নত বলে কেন মনে করা হয়? এর কি কোনো দুর্বল দিক নেই?

উ: নরওয়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উন্নত বলার অনেক কারণ আছে, আর আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও গবেষণা থেকে বলতে পারি, এটা সত্যিই দারুণ। প্রথমত, সর্বজনীন প্রবেশাধিকার – মানে দেশের প্রতিটি নাগরিক, সে যে আর্থ-সামাজিক অবস্থারই হোক না কেন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রাখে। দ্বিতীয়ত, প্রতিরোধমূলক যত্নে তাদের জোর দেওয়াটা খুব প্রশংসনীয়। তারা শুধু রোগ হলে চিকিৎসা দেয় না, বরং রোগ যাতে না হয় সেদিকেও গুরুত্ব দেয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত চেকআপের বিষয়ে তারা মানুষকে উৎসাহিত করে।
আর প্রযুক্তির ব্যবহার?
সেটা তো অসাধারণ! তাদের ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড সিস্টেম এত গোছানো যে একজন ডাক্তারের পক্ষে রোগীর সব তথ্য এক ক্লিকেই দেখা সম্ভব। কিন্তু হ্যাঁ, ভালো জিনিসেরও কিছু দুর্বল দিক থাকতে পারে। আমার মনে হয়েছে, জরুরি নয় এমন বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য অপেক্ষার সময়টা একটু বেশি হতে পারে। যেমন, কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে জরুরি চিকিৎসা কিন্তু সব সময় দ্রুতই পাওয়া যায়। এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময়টা কিছু মানুষের জন্য একটু অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে এর সুবিধাগুলো এই ছোটখাটো অসুবিধাগুলোকে অনেকটাই ছাপিয়ে যায়। আমার মতে, এরকম একটি মানবিক ও সুসংগঠিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা truly inspirational!

📚 তথ্যসূত্র

Advertisement